কুড়িগ্রামরংপুরস্থানীয়

কুড়িগ্রামে বন্যার্তদের তারাগঞ্জ শুভসংঘের খাদ্য সহায়তা

এনামুল হক দুখু:-

কালের কণ্ঠ শুভসংঘ তারাগঞ্জ উপজেলা শাখা, রংপুর রবিবার (২৬ জুন) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্যা কবলিত দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্য জেলা কুড়িগ্রামের ১৫০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা করেছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যায় তলিয়ে গেছে। চারদিকে হাহাকার। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন তাদের সুপেয় পানি,শুকনো খাবারের জন্য কষ্টে দিনযাপন করছে। শুভসংঘ তারাগঞ্জ শাখার বন্ধুরা এসব দেখে স্থির থাকতে পারলো না। তাঁরা তাদের সামর্থ অনুযায়ী কুড়িগ্রামের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলো। সিদ্ধান্ত নিয়ে ছুটে গেলো কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ৯ নং যাত্রাপুর ইউনিয়নের ভগপতিপুর ৬ নং ওয়ার্ডে।

ধরলা নদীতে পানির প্রবল স্রোত। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় ধরে গন্তব্য স্থানে পৌছালো তারাগঞ্জ শুভসংঘ শাখার বন্ধুরা। চারদিকে পানি আর পানি। পানির মাঝখানে উচু চরে ভগপতিপুর গ্রামের প্রায় ২০০ পরিবারের বসবাস। পানি বন্দি হয়ে পড়ায় তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যে দিন কোন খাবার কেউ তাদেরকে দেন সেদিন তাদের মুখে খাবার জোটে আর যে দিন কেউ সহযোগিতার খাবার নিয়ে না আসেন সে দিন তাদেরকে না খেয়েই থাকতে হয়।

শুভসংঘের খাদ্যের উপহারের নৌকাটির ইঞ্জিনের শব্দ শোনার সাথে সাথে ভগপতিপুর গ্রামটির পুরুষ মহিলা ও শিশুরা খাবারের প্যাকেটের জন্য নৌকাটির কাছে এসে জড়ো হন। উপহারের নৌকাটি কাছে পেয়ে যেনো আনন্দের বন্যা বইছিলো তাদের মধ্যে।

বয়সের ভারে হাতে লাঠি নিয়েছে। কোমর ভাঁজ হয়েছে, স্বাস্থ্য ক্ষীণ হয়েছে। শরীর ভাল নেই। গায়ে জ্বর জ্বর অনুভব হচ্ছে। এখন আর ঠিক মতো চলতে পারে না। শরীরের কোন জোরশক্তি নেই। ট্যাবলেট কিনে খাওয়ার মত সামর্থ নেই। আপনাদের খাদ্যের উপহারের ব্যাগটি আমাকে দিলেন এটি দিয়ে পেট ভরে খাইতে পারবো। পেটে খাদ্য না থাকলে কিছুই ভাল লাগে না। আপনারা আমাকে যে খাবারের সহযোগিতা করলেন আল্লাহ্ আপনাদের ভাল করবে। আল্লাহ্ আপনাদের ভাল রাখুক। আপনারা আমাদের মত গরীব মানুষদের খবর রাখেন এর সওয়াব আপনারা পাবেন। কথাগুলো বলছিলো ভগপতিপুর গ্রামের ৮০ বছরের বৃদ্ধ তাঁরা মিস্ত্রি।

৯০ বছরের বয়স্ক আলম হোসেন বলেন, বাবা প্রতি বছর আমরা বন্যার পানিতে সব হারিয়ে নিঃশ্ব হয়ে যাই।
৭০ বছরের বৃদ্ধ গোলজার হোসেন তাঁর আটকে যাওয়া কণ্ঠে ভাঙ্গা গলায় বলেন, বাবা আপনারা তো শিক্ষিত মানুষ। আমি তো কালের কণ্ঠ পেপার আগে পরতাম। এখন তো পেটে ভাতই যাচ্ছে না পেপার পড়ি কেমন করে।

আপনারা পেপারে লিখে দিয়েন তো সরকার যেনো আমাদের পার্শ্বে একটু সুদৃষ্টি দেয়। আমাদের জন্য যেনো স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করে দেয়। আর কদিন বাঁচবো বাবা। শেষ জীবনের কয়েকটা দিন যেনো বন্যার পানিতে আর ভাসতে না হয় সেই ব্যবস্থা যেনো শেখ হাসিনা সরকার আমাদের করে দেয়।

৬০ বছরের বৃদ্ধা আমেনা বেগমও এসেছেন নাতির ঘারে ভার দিয়ে শুভসংঘের খাদ্য সহায়তার প্যাকেট নিতে। চোখেমুখে বিষণ্নতার ছোয়া। হাহাকার নিয়ে বেঁচে আছেন। জীবনে কিছুই যেন নেই তাঁর। আছে শুধু জীবন জুড়ে দুঃখ আর কষ্ট। তাঁর এই ৬০ বছরের জীবনে কতবার যে নিজের ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছেন তাঁর কোন ইয়ত্তা জানা নেই তাঁর।

এখন আছেন সরকারের সহায়তার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে। সে বলে আমার নিজের যে ছেলে আছে সে নিজেই খেতে পারে না। আমাকে খাওয়াবে কি। আপনাদের জন্য দোয়া করবো আল্লাহ্ তোমাদের ভাল রাখবে।
এরকম আরও খাদ্য উপহার নিতে আসা বয়জোষ্ঠ শমসের আলী ও মিনহাজ আলীও খাদ্যের প্যাকেটটি হাতে নিয়ে চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক লক্ষ্য করছিলো শুভসংঘের বন্ধুরা।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল গফুর হোসেনের ছেলে আলহাজ্ব মোঃ ওমর ফারুক হোসেন বলেন, এ এলাকার লোকজনেরা কি কষ্টে যে দিনযাপন করেন তা না দেখে কেউ ধারনা করতে পারবে না। কষ্টদুঃখ তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। উপযুক্ত স্থানে তাদের স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা করলে খুব ভাল হবে।

এ বছরের বন্যায় এ এলাকার প্রায় ২৫০ পরিবার বাড়িঘর হারিয়ে পুরাই নিঃশ্ব হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে এভাবে নিঃশ্ব হয়ে যায় হাজারও পরিবার। এ এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদীর বাঁধটি নির্মাণ হলে এ দুর্ভোগ আর পোহাতে হবে না তাদের। তাই সরকার দ্রুত বাঁধটি নির্মাণ করলে আমাদের এ এলাকার মানুষদের প্রতি বছর পানিতে ঘরবাড়ি সব হারিয়ে নিঃশ্ব হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

এসময় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ তারাগঞ্জ উপজেলা শাখার উপদেষ্টা আব্দুস সাত্তার বলেন, শুভসংঘ সবসময় সকল শুভ কাজে পাশে রয়েছে। আপনাদের কষ্টের কথা জানতে পেরে আমরা রংপুরের তারাগঞ্জ থেকে ছুটে এসেছি খাদ্যের উপহারের প্যাকেট নিয়ে। গরীব দুঃখীদের পক্ষে কাজ করতে পারলে আমাদের শুভসংঘের খুব ভাল লাগে।

শুভসংঘ তারাগঞ্জ শাখার সিনিয়র সহসভাপতি সুজন বাবু বলেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেয়ে না খেয়ে দিনযাপন করতেছেন আপনারা। অনেক কষ্ট হচ্ছে আপনাদের দেখে। আমরা যে খাদ্য উপহার নিয়ে এসেছি তা আপনারা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পরিবারের সকলে মিলেমিশে খাবেন।

খাদ্য উপহারের সময় উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘ তারাগঞ্জ উপজেলা শাখা রংপুরের উপদেষ্টা আব্দুস সাত্তার, উপদেষ্টা মোঃ মাহামুদুল হাসান মিঠু, উপদেষ্টা মোঃ রাসেল মন্ডল, উপদেষ্টা আব্দুল হামিদ, সভাপতি এনামুল হক দুখু, সিনিয়র সহসভাপতি সুজন বাবু,

সহসভাপতি মোছাঃ নাজমা খানম, সাধারণ সম্পাদক দীপংকর রায় দিপু, সাংগঠনিক সম্পাদক রহমত মÐল, শরিফুল ইসলাম, লালবাবু রায়, নিহার রঞ্জন বর্মা,

সাংবাদিক ইউসুফ আলমগীর, স্বপন কুমার সরকার, আশরাফুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, বিশ্বজিৎ রায়, আহমেদ আয়াতুল্লাহ্ মেজবাহ্, জামিনুর ইসলাম, মোছাঃ শাহাজাদী শারমিন প্রমুখ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button