রংপুরস্থানীয়

তারাগঞ্জে নানার বাড়িতে শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু,বাবা-খালা-প্রতিবেশি যা বললেন

[ পুত্র শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন সাহিবুলের মা শারমিন বেগম। ভালোভাবে হাটা-চলা করতে পারছেন না। তাকে হাটা-চলা করতে সাহায্য করছেন তার বড় বোন মাহমুদা -ছবি- প্রতিনিধি ]

তারার আলো খবর :

পারিবারিক কলহের জেরে ৬ থেকে ৭ বছর আগে সংসার ভাঙ্গে রফিকুল ইসলাম ও শারমিন বেগমের।

ভাঙ্গা সংসার থেকে ভেঙ্গে যাওয়া হৃদয় নিয়ে শারমিন তার দুই ছেলে সাহিবুল ও শাকিবকে নিয়ে চলে আসেন হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের জুম্মাপাড়ায় অবস্থিত স্বামী রফিকুলের বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন ইকরচালী ইউনিয়নের বামনদীঘি হাজীপাড়া গ্রামে অবস্থানরত বাবা মকবুল হোসেনের বাড়িতে।

নিজের পায়ে দাড়াতে ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে বড় বোনের সহায়তায় চাকরি নেন ঢাকায় অবস্থিত কোন এক কোম্পানিতে। সেখান থেকে গত বুধবার বাবার বাড়িতে বড় ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বাবার বাড়িতে ছুটে আসেন পরের দিন সকালেই। বুধবার রাতেই খবর পায় সাহিবুলের বাবা রফিকুল ইসলামও।

খবর পেয়ে তারাগঞ্জ থানায় ছেলের রহস্যজনক মৃত্যুর অভিযোগ করেন রফিকুল। খবর পেয়ে তারাগঞ্জ থানার একদল পুলিশ নানা মকবুল ইসলামের বাড়ি থেকে বৃহস্পতিবার সকালে শোবার ঘর থেকে সাজ্জিদ ইসলাম সাহিবুলের (১৫) লাশ উদ্ধার করেন।

এরপর ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয় কিশোর সাহিবুলের মৃতদেহ। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার রমেক হাসপাতাল থেকে বাবা রফিকুলের হাতে লাশ হস্তান্তর করা হয়। লাশ নিয়ে বাড়িতে ফিরলে রফিকুলের বাড়িতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের।

কাঁদতে কাঁদতে একদিকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন সাহিবুলের মা ও লাশ দেখতে আসা খালা অপরদিকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন সাহিবুলের দাদী।

সরেজমিনে শুক্রবার এমনই দৃশ্য চোখে পড়ে রফিকুল ইসলামের বাড়িতে। এসময় রফিকুল জানান, মোর বেটাক মারি ফেলেয়া এখন মোক টাকা দিয়া মিমাংসা করিবার চেষ্টা করোছে। কিন্তু মুই টাকা নেইম না। মুই মোর বেটার হত্যার বিচার চাও।

এর আগে গত বুধবার (৮ ডিসেম্বর) রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের বামনদীঘি ইকোপার্কের পার্শ্ববর্তী হাজীপাড়া গ্রামে বসবাসরত নানা মকবুল হোসেনের বাড়িতে মৃত্যু ঘটে ইকরচালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া সাজ্জিদ ইসলাম সাহিবুলের।

খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে মকবুল হোসেনের বাড়ির শোবার ঘর থেকে ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাহিবুল একই উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কিসামত মেনানগর জুম্মাপাড়া গ্রামের রফিকুল ও শারমিন বেগম দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে বড় সন্তান।

সন্তানের অকাল মৃত্যুতে একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছেন নিজ বাড়িতে বসবাসরত বাবা রফিকুল ও বাবার বাড়িতে অবস্থানরত মা শারমিন। শনিবার সন্ধ্যায় মকবুলের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, সন্তান বিয়োগে কাতর মা শারমিন শয্যাশায়ি হয়ে পড়েছেন। কান্না করছেন অবিরত।

কিশোর সন্তানের অকাল মৃত্যুর কারণ কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। সেখানে অবস্থানরত খালা মাহমুদা ও তহমিনা বলেন, সাহিবুলের জন্ম হয়েছিল নানার বাড়িতেই। এখানেই সে ছোট থেকে বড় হয়েছে।

নানা-নানীসহ সকলেরই অতি আদরের এক দুরন্তপণা কিশোর ছিল সাহিবুল। তবে বেশ কিছুদিন ধরে সে মোবাইলে ফ্রি ফায়ার গেম খেলার প্রতি আশক্ত হয়ে পড়েছিল। ঘটনার দিন বুধবারেও সে সারাদিন মোবাইলে গেম খেলে। এরপর সন্ধ্যায় ঘরের দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে শুয়ে পড়ে।

একই ঘরে ঘুমাতো সাহিবুলের ছোট ভাই সাকিব। সন্ধ্যার কিছু পরে ঘরে ঢুকতে গেলে দরজা বন্ধ দেখে বড় ভাইকে ডাকাডাকি করেও কোন সাড়া না পাওয়ায় টিন খুলে ঘরে প্রবেশ করে দরজা খুলে দেয়। এরপর বাড়ির সবাই সাহিবুলকে জাগানোর চেষ্টা করলে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর দুই খালা আরো বলেন, ঘটনা কিছুই হয় নাই।

সাহিবুল অতিরিক্ত মোবাইলত ফ্রি ফায়ার গেম খেলাত আসক্তি থাকি হয়তো স্ট্রোক করছিল। তাই এই ঘটনা ঘটেছে। আর মানুষ ছড়ায়ছে সাহিবুলোক মারি ফেলাছি। যায় ছওয়ালোক আদর করে তায় কি সেই ছাওয়ালোক মারিবার পায়?

এর আগে বৃহস্পতিবার কিশোরের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে লাশ দেখতে ভীড় জমে মকবুল হোসেনের বড়িতে। এসময় কথা হয় মকবুলের প্রতিবেশী দুইজন নারীর সাথে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুই নারী জানান, সাহিবুলের মামা বুধবার সাহিবুলোক আলু গারতে (আলুর বীজ বপন করতে) যাবার কইছিল। কিন্তু সাহিবুল আলু গারির না যেয়া সারাদিন মোবইলত গেম খেলাইছে।

সন্ধার সময় ওর মামা বাড়ি আসি সাহিবুলের মোবাইলটা কারি নিয়া (কেড়ে নেওয়া) ঘরোত দরজা লাগে ডাংগা-মারা (মারধর) করছিল। তার কিছুক্ষণ পরে ওমার বাড়িত কান্দাকান্দি (কান্নাকাটি)। দৌড়িযেয়া শুনি সাহিবুল বিছানাত মরি আছে।

এবিষয়ে তারাগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফারুক আহমেদ বলেন, আমরা ওই কিশোরের মৃত্যুর ব্যাপারে কোন অভিযোগ পাইনি। তবে খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে মকবুল হোসেনের বাড়ির শোবার ঘর থেকে ওই কিশোরের লাশ উদ্ধার করি।

তার মৃত্যুটি রহস্যজনক মনে হওয়ায় লাশের ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। লাশের গায়ে কোন আঘাতের চিহ্ন পাইনি।

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসলে ওই কিশোরের মৃত্যুর আসল রহস্য জেনে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button