কুড়িগ্রামরংপুর

পুলিশ কর্মকর্তা পেয়ারুলের জীবন দিয়ে দায়িত্ব পালন,তার বাড়িতে শোকের মাতম

তারার আলো অনলাইন ডেস্ক: ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক করতে গিয়ে খুন হন পুলিশের এএসআই পেয়ারুল ইসলাম। উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হবার পরেও জীবনবাজি রেখে মাদক ব্যবসায়ী পলাশকে জাপটে ধরে ছিলেন পেয়ারুল ইসলাম। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করলেন তার দায়িত্ব আর কর্মনিষ্ঠার।

রংপুরের হারাগাছ থানার বাহারকাছনা তেলিপাড়া এলাকায় ১৫১ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী পলাশকে আটক করার সময় তার হাতে থাকা ছুরি দিয়ে বুকে-পিঠে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে মাদক ব্যবসায়ী পলাশ।

হারাগাছ মেট্রোপলিটন থানার ওসি শওকত হোসেন পুলিশ কর্মকর্তা পেয়ারুল ইসলাম নিহত হবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ জানায়, শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাতে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে হারাগাছ থানার এএসআই পেয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ বাহারকাছনা তেলিপাড়া এলাকা থেকে মাদক ব্যবসায়ী পলাশকে আটক করে। তার শরীর তল্লাশি চালিয়ে ১৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় মাদক ব্যবসায়ী পলাশ এএসআই পেয়ারুল ইসলামকে তার হাতে থাকা ছুরি দিয়ে পেটে উপযুপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে।

এরপরই এলাকাবাসী ও পুলিশের অন্য সদস্যরা তাকে আটক করতে সক্ষম হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় পেয়ারুল ইসলামকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে এগারটায় তিনি মারা যান। নিহত এএসআই পেয়ারুল ইসলামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামে। বাবার নাম আবদুর রহমান বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এদিকে গুরুতর আহত হবার খবর পেয়ে পুলিশের পেয়ারুল ইসলামের বাবা মেরাজুল ইসলাম, চাচাতো ভাই সালাম, আনোয়ারুলসহ অন্য স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে আসেন। কিন্তু রাতে তার অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শনিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) মারা যান।

এ সময় স্বজন ও সহকর্মীদের আহাজারিতে হাসপাতালের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। নিহত পেয়ারুল ইসলামের স্বজনরা খুনি মাদক ব্যবসায়ী পলাশের ফাঁসি দাবি করে।

এএসআই পেয়ারুল ইসলামের নিহত হবার খবর পেয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল আলীম মাহমুদ অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার কাজী ইবনে মিজান উপপুলিশ কমিশনার ক্রাইম মারুফ হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে আসেন। উপপুলিশ কমিশনার ডিবি কাজী ইবনে মিজান জানান, পেয়ারুল ইসলাম জীবনের বিনিময়ে প্রমাণ করেছেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তাদের কর্তব্যপরায়ণতায় কতটা অবিচল। তিনি বলেন, ঘটনাটিকে আমরা সিরিয়াসলি নিয়েছি। এর সঙ্গে আর কারা কারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হবে।

এদিকে নিহত পুলিশ কর্মকর্তার মরদেহ দুপুর দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতালের ডেড হাউজে রাখা হয়। পরে দুপুর দুইটার দিকে ময়নাতদন্ত করার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গে নিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

হারাগাছ থানার ওসি শওকত আলী জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের পর নিহত এএসআই পেয়ারুল ইসলামকে পুলিশ লাইনে নেয়া হয়েছে সেখানে জানাজা শেষে তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে তাকে তার গ্রামের বাড়ি রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামে নেয়া হয়।

পেয়ারুলের বাড়িতে শোকের মাতম:-

এদিকে রংপুরের হারাগাছে মাদক কারবারির ছুরিকাঘাতে নিহত পেয়ারুল ইসলামের লাশ আনার পর তার বাড়িতে শুরু হয় শোকের মাতম। শনিবার সন্ধ্যার পর নিজ গ্রামে দাফন করা হয় পিয়ারুল ইসলামকে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম জানান, রংপুরের হারাগাছ থানায় কর্মরত এএসআই পেয়ারুল ইসলামের মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না তার পরিবারসহ এলাকাবাসী। সে একজন স্বজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল বড়। তার বাবা আবদুর রহমান মিন্টু চন্দ্রপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। পিয়ারুল ইসলাম দীর্ঘ একযুগ ধরে পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগের আওতায় হারাগাছ থানায় কর্মরত ছিলেন। তার দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে। প্রথমটির বয়স ৭ এবং দ্বিতীয়টির বয়স দেড় বছর।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট থানার ওসি রাজু সরকার জানান, এএসআই পেয়ারুল ইসলামের প্রথম জানাজা রংপুর পুলিশ লাইন মাঠে বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজা রাত ৯টায় তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাকে চন্দ্রপাড়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ সময় পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসী অংশগ্রহণ করেন।

নিহত পেয়ারুল ইসলামের বাবা আবদুর রহমান মিন্টু জানান, আমার সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে সে। এ জন্য আমি গর্ব অনুভব করি। হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button