রংপুরস্থানীয়

সেই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক বন্ধু এখনও লাইফ সাপোর্টে, নিহত দুই বন্ধুর দাফন সম্পূর্ন, এলাকায় শোকের ছায়া

তারার আলো খবর/দিপক রায়: বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় ১০টা। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের বিড়াবাড়ি ফকিরপাড়া গ্রাম। একই গ্রামের তিন বন্ধু হারুন, মনিরুল ও বেলাল প্রতিবেশীর একটি মটরসাইকেল ধার করে রওয়ানা হয় পাশ্ববর্তী সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর গ্রামে বসবাসরত অপর এক বন্ধুর বাড়িতে ঈদের দাওয়াতে অংশ নিতে। দুপুরের খাবার বন্ধুর বাড়িতে খেয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হয় আনুমানিক প্রায় দুইটার দিকে। তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে পৌঁছলে শুরু হয় বৃষ্টি। এসময় তারা বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা পেতে ঠাই নেয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত তেল পাম্পে। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে গেলে তারা আবারও রওয়ানা হয় বাড়ির পথে। তখন সময় প্রায় বিকেল ৩টা। তারা নির্মাণাধীন পল্লী উন্নয়ন একাডেমী পিছনে ফেলে ইকরচালী তেল পাম্পকেও পিছনে ফেলেছে সবেমাত্র।

এসময় মটরসাইকেল চালক বেলালের নজরে পড়ে সামনে থেকে দ্রুত গতিতে ছুটে আসা ৩টি ট্রাককে। যারা একে অপরকে ওভারটেকিংয়ের চেষ্টায় ব্যস্ত। বেলাল তার মটরসাইকেলটিকে মহাসড়কের ধারে মাটিতে নামিয়ে দেয়। কিন্তু সেখানে থাকা ছোট ছোট জঙ্গলের গাছে স্লিপ করে মটরসাইকেলটি। এতে মটরসাইকেলটি ডান দিকে পড়ে যায় এবং তিন বন্ধুই ছিটকে পড়ে মহাসড়কে। ঠিক সেই মূহুর্তেই সামনে থেকে ওভারটেকিং করা একটি ট্রাক তাদের প্রচন্ড জোরে ধাক্কা দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে যায় সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে। আর সেই সাথেই হঠাৎ করেই থেমে যায় ৩ বন্ধুর চঞ্চলতা। নিথরভাবে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে পড়ে থাকে তিন বন্ধুর শরীর। মটরসাইকেলের পিছনে বসা হারুন পড়ে থাকে কাত হয়ে। তাঁর মাথা থেতলে মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় মহাসড়কে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় হারুনের। তাঁরই কোলের উপর উপুর হয়ে পড়ে থাকে মটরসাইকেলটির মধ্যখানে বসা মনিরুলের শরীরের একাংশ। মাথার সামনের অংশ ফেটে মগজ বের হয়ে জমা হতে থাকে পাশেই। তখনও শরীরে শ্বাস-প্রশ্বাস বোঝা যাচ্ছিল। তবে তা অত্যন্ত ধীরগতিতে। তাঁদের দুইজনের পাশে অজ্ঞান অবস্থায় চিত হয়ে পড়ে ছিল মটরসাইকেল চালক বেলাল। তাঁর কপালে মধ্যখানে দুর্ঘটনায় সৃষ্ট গভীর গর্ত থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছিল রক্ত। এসময় সেখানে অবস্থানরত কয়েকজন পথচারি খবর দেয় তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানা ও তারাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। কিন্তু হাইওয়ে থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছতে বেশকিছু সময় লেগে যায় । ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা বেলালকে উদ্ধার করে হাইওয়ে থানার গাড়িতে তুলে দেয় রংপুর মেডিক্যাল নেওয়ার জন্য। আর মনিরুলকে তুলে নেয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীদের আসা গাড়িতে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নেওয়ার পর অক্সিজেন মাস্ক লাগানো হয় মাথা থেকে অর্ধেক মগজ বের হয়ে যাওয়া মনিরুলের মুখে। সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মনিরুল। আর বেলালকে জরুরী বিভাগে রাখা হয়েছে নিবির পরিচর্যায়। সেও রয়েছে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায়। শুক্রবার বিড়াবাড়ি ফকিরপাড়ায় সরেজমিনে গেলে এমনই ঘটনা জানা যায় বৃহস্পতিবার তারাগঞ্জের ইকরচালীতে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হারুন ও মনির এবং গুরুতর আহত বেলালের পরিবার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে।
সরেজমিনে গিয়ে আরো জানা যায়, ঘটনাস্থলে নিহত হারুন-অর-রশিদ (১৭) তারাগঞ্জ বিএম কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ইকরচালী ইউনিয়নের বিড়াবাড়ি হাট সংলগ্ন ফকিরপাড়া গ্রামের অজির উদ্দিনের ৪ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান হারুন। রমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত মনিরুজ্জামান মনির (১৬) এবছর তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী। ওই গ্রামেরই মতিয়ার রহমানের ৩ সন্তানের সবার ছোট মনির। পরিবারের সকলের আদরের সন্তান সে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজের জরুরী বিভাগে নিবিড় পরিচর্যায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন বেলাল হোসেন (১৬) তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী।। একই গ্রামের মোঃ মোস্তফার ৪ সন্তানের সবার ছোট বেলাল। উক্ত সড়ক দুর্ঘটনায় একই গ্রামের দুইজন নিহত ও একজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকার ঘটনায় শোঁকের ছায়া নেমেছে পুরো গ্রাম জুড়ে। সেই সাথে আতঙ্কের মধ্যে কোনরকম দিনযাপন করছে বেলাল হোসেনের পরিবারের লোকজনসহ প্রতিবেশীরা। বেলালের দ্রুত সুস্থতার লক্ষ্যে সকলের দোয়া প্রার্থনা করছে বেলালের বাবা মোস্তফা ও মা মাজেদা বেগম।
ইকরচালী ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক উক্ত সড়ক দুর্ঘটনায় দুই জনেরই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button